ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১, ৫ আশ্বিন ১৪২৮, স্থানীয় সময়: ৮:৩৩ am

নিরুপায়ের নির্বেদ

| ২৬ ফাল্গুন ১৪২১ | Tuesday, March 10, 2015

257222_139413206133970_5305644_o.jpgএকজন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী বা গণিতবিদ কবির কবিতা সৃষ্টির মতো শুধুই মাথা খাটিয়ে স্রেফ সাদা কাগজে একটি মূল্যবান গবেষণাপত্র তৈরি করতে পারেন, পারেন একজন জীববিজ্ঞানীও সামান্য যন্ত্রপাতির সাহায্যে বা সাহায্য ছাড়াই, বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও এমন সূযোগ থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে কি তা ঘটে? আমার এক বন্ধু তরুণ তত্ত্বীয় পদার্থবিদ রাশিয়ার দুবনায় বিজ্ঞাননগরে কাজ করেন। সমাজতন্ত্রের পতনের পর রাশিয়ার তত্ত্বীয় বিজ্ঞানে অর্থযোগান বন্ধ হলে তারা খুবই কষ্টে পড়েন, বেতন হয়ে উঠেছিল খুবই কম ও অনিয়মিত, হেঁসেলে কড়াই বসত না অনেকের। কিন্তু তাতেও তাদের গবেষণাকর্ম থেমে থাকেনি। আমাদের দেশে কি এমনটি ভাবা যায়? কেন ভাবা যায় না? উনিশ শতকে ইংল্যাণ্ডে বিজ্ঞানীর পেশা মোটেই আকর্ষণীয় ছিল না। তারা সামান্য যন্ত্রপাতি দিয়ে কেবল ব্যাক্তিগত উদ্যমেই কত অসাধ্য সাধন করেছেন, অনেকে আমাদের দেশে এসেও এই স্বাক্ষর রেখে গেছেন। এই উদ্যমের অভাব কেন আমাদের? সৃজনশীলতার মূলে আছে সামাজিক রূপান্তর, ইউরোপে সামন্ততন্ত্র থেকে ধনতন্ত্রের উৎপত্তি এবং কিছুটা আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা।
বিজ্ঞানের সঙ্গে সামাজের সম্পর্ক নিবিড় ও গভীর এবং বর্তমান যুগে মিথোজীবিতামূলক বলাও অত্যুক্তি নয়। ধনতান্ত্রিক সমাজ একটি শিল্পশাসিত সমাজ এবং নানা রকমফের সহ এটি আজ পৃথিবীর সকল দেশেই বিদ্যমান। জ্ঞান তিনটি সোস্যাল ফর্মেশন— সামন্ততান্ত্রিক, ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক, মার্কসের তত্ত্ব অনুসারে, উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের দন্ডের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত, কোথাও বিপ্লব ঘটিয়ে, কোথাও আপসে, আর এই উৎপাদিকা শক্তি বিকাশের চাহিদা থেকে এসেছে প্রযুক্তবিদ্যা– যা বিজ্ঞানের প্রায়োগিক রূপ। সামাজিক প্রয়োজনই সৃষ্টির উদ্দীপনা যোগায় এবং সামাজিক রূপান্তরের সময়তার উচ্ছ্রয় ঘটে। সামন্ততন্ত্র থেকে ধনতন্ত্রে উত্তরণে শুধু সমাজের কাঠামোই বদলায় না, মানুষের মনোজগতেও বিপ্লব ঘটেছিল। কিছু পুরনো ভাবনা পরিত্যাক্ত হয়, অনেকগুলি নতুন সমাজে আত্তীভূতও হয়, দেখা দেয় নতুন সমাজের সঙ্গে সঙ্গতিশীল নতুন নতুন চিন্তা, গড়ে ওঠে একটি নতুন সংস্কৃতি আর এটা সামজে কতটা মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে তার সঙ্গে আনুপাতিকও। এভাবেই আমরা আমাদের বিজ্ঞানের সমস্যাটি বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি।
মোগল শাসনে বাংলায় বিদ্যমান সামন্ততন্ত্র ছিল এককেন্দ্রিক, স্থানীয় জমিদাররা ছিলেন রাজস্ব আদায়কারী, প্রজারা ছিল জমির যথার্থ মালিক। ব্রিটিশ শাসনে এই ব্যবস্থার অমূল পরিবর্তন ঘটে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমির মালিক হয়ে ওঠে জমিদার, প্রজারা ভূসম্পদের চিরকালীন মালিকানা হারায় আর এই ব্যবস্থা অটুট ছিল ১৯৪৭ সালের ভারতবিভাগ পর্যন্ত। ব্রিটিশরা এদেশে নিজ স্বার্থেই সীমিত পরিমাণ শিল্পোদ্যোগ নির্মাণ করে, গড়ে তোলে তদানুরূপ অবকাঠাম, কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক ভূমিব্যবস্থার দরুন এদেশের গ্রামাঞ্চল মধ্যযুগেই থেকে যায়, সামান্য যেটুকু আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে তা ছিল শুধুই শহরে এবং অত্যন্ত সীমিত পরিসরে। একেই আমরা বাংলার রেনেসাঁ বলি। ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে জমিদারী উচ্ছেদ হলে সামন্ততন্ত্রের পতন ঘটে। কিন্তু সমাজের কোনই মৌলিক পরিবর্তন ঘটে না, কেননা পাকিস্তানি শাসকরাও ছিলেন বিদেশী এবং এদেশে তারা আরেকটি ঔপনিবেশিক শাসন চালু করেন। অধিকন্তু, নিজেদের আধিপত্য আড়াল করার জন্য তারা একটি পশ্চাদপদ ভাবাদর্শ, দ্বিজাতিতত্ত্ব চালু করেন, যা ছিল প্রগতির প্রতিপক্ষ এবং বাংলার জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এই ধরনের ব্যবস্থা দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখা যায় না, শুরু হয় রাজনৈতিক সংঘাত এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রম ও বাংলাদেশ নামের একটি নতুন রাস্ট্রের অভ্যূদয়।
আমরা আশা করেছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে এমন একটি সমাজকাঠামো নির্মিত হবে যেখানে শিল্পের বিকাশ ঘটবে, সবস্তরের মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতার উচ্ছ্রয় ঘটবে, সৃষ্টি হবে একটি নতুন সংস্কৃতি এবং সেই চাহিদা মেটাতেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতি ঘটবে। কিন্তু তা ঘটে নি। কেন ঘটেনি সে প্রশ্ন খুবই জটিল, অর্থনীতিবিদ ও সমাজত্ত্ববিদেরা হয়ত সেই জট খুলতে পারেন, বিজ্ঞানীদের পক্ষে তা আরও কঠিন।
দুটি ঔপনেশিক শাসন, তাদের সৃষ্ট সেই সমাজবিকাশের প্রতিবন্ধের কথা ইতোপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, এখন জুটেছে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের আধিপত্য, যার অনুমোদন ছাড়া আমাদের দেশে কোন খাতেই কোন পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এই সঙ্গে আছে আমাদের রাজনীতিকদের সংকীর্ণতা, অদূরদর্শিতা, আশুলাভের অত্যাধিক আগ্রহ। এমতাবস্থায় কী করলে সমাজের সৃজনশীলতার উচ্ছ্রয় ঘটবে, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে, বিজ্ঞানে প্রাণসঞ্চার ঘটবে, তেমন ভাবনার অবকাশ আমাদের রাজনৈতিক মহলে আদৌ নাই। আমরা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও বিদেশী দাতাসংস্থার উপর নির্ভরশীল। এই বিভক্তি ও পরনির্ভরতাই গোটা জাতির মনে একটি হতাশা সৃষ্টি করে, যা সৃজনশীলতার উৎসে পাথর চাপা দেয়, আর তা ঘটেছে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও।
বিজ্ঞানের নেতৃত্বের প্রয়োজন আছে। কুদরত-এ-খুদার পর আমাদের বিজ্ঞানে আর কোন নেতা আমরা পাইনি। তিনি ছিলেন সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহার মতোই বাঙ্গালী রেনেসাঁর শেষ প্রজন্মের মানুষ। কিন্তু প্রতিকূল সামাজিক প্রতিবন্ধে (পাকিস্তানী ঔপনিবেশিকতা) তিনি বাংলাদেশে এমন কোন কাঠামো নির্মাণ করতে পারেন নি যা পরবর্তীকালে স্বতস্ফূর্তভাবে বিজ্ঞানী সৃষ্টি করবে। তার শেষকীর্তি একটি শিক্ষাকমিশন, সেটা বাস্তবায়িত হলে অন্তত শিক্ষাক্ষেত্রে সৃজনশীলতার আবহ সৃষ্টি হত এবং তাতে শেষাবধি বিজ্ঞানও উপকৃত হত। কিন্তু তা হল না এবং কেন হল না সেখানে সমাজতাত্ত্বিক খোঁড়াখুড়ি চালালেই মিলবে আমাদের বর্তমান দূরাবস্থার কিছু কিছু উপকরণ। কিন্তু এ কাজটির নেতৃত্বও বিজ্ঞানীরা দিতে পারেন না।
যে উচ্চশিক্ষা কর্মোদ্যোগে বিজ্ঞানী যোগান দেয় তার অবস্থা আজ ভয়ঙ্কর। মফস্বল কলেজ থেকেও এখন øাতকোত্তর ডিগ্রি পাওয়া যায়। এমনটি আমাদের ছাত্র জীবনে অকল্পনীয় ছিল। আমি এমন একটি কলেজে ষাটের দশকের শুরুতে উদ্ভিদবিদ্যার øাতক (পাস) কোর্স খোলি। বেসরকারী কলেজে সম্ভবত প্রথম। দিনরাত পরিশ্রম, কর্তৃপক্ষের সহায়তা ও ছাত্রদের সাহায্যে গড়ে তুলি একটি ছোট মিউজিয়াম, হার্বোরিয়াম, লাইব্রেরি। শুরু হয়েছিল ৩ জন ছাত্র নিয়ে, কয়েক বছরেও সেই সংখ্যা ৮-১০ জন অতিক্রম করেনি। øাতোকাত্তর দূরে থাক অনার্সের কথাও কল্পনা করতে পারতাম না। নিজে গবেষণা করতাম, ছাত্রদের নিয়ে সংগ্রহ অভিযানে (সৌখিন ভ্রমন নয়) গেছি, সর্বক্ষণ ল্যাবরেটরিতে পড়ে থাকতাম। আজও মনে করি কলেজে øাতক পর্যায়ে পাস কোর্সের অধিক কিছু থাকা নি¯প্রয়োজন। আমার একাধিক কৃতি ছাত্রছাত্রী আছেন যারা এই কলেজ শিক্ষার ঋণ স্বীকার করেন। বর্তমানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে উচ্চশিক্ষার কাঠামো পরিবর্তন আবশ্যক, তবে উচ্চশিক্ষা সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে নয়, কেন্দ্রীভূত করে, নইলে এই শিক্ষার গুণগত মানের বিনাশ ঘটবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত কোর্স বিভাজনের কথা ভাবা যেতে পারে, যাতে আমাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সম্ভারের সর্বোত্তম ব্যবস্থার সম্ভব হয়।
তাই বলে বাংলাদেশে বিজ্ঞান গবেষণা থেমে যায় নি। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে কেউ কেউ গবেষণা করছেন, মৌলিক নিবন্ধ লিখছেন। কিন্তু তারা একক ও নিঃসঙ্গ। তাই তাদের আধুনিক বিজ্ঞানী না বলে চিরায়ত বিজ্ঞানের অনুসারীই বলতে চাই, যে-বিজ্ঞান শুরু হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে। এই অর্থে যতটা না তারা নিউটন, আইনস্টাইনের উত্তারাধীকারী, তার চেয়ে প্রাচীন ভারত, আরব, চীন ও গ্রীসের বিজ্ঞানীদের ঘনিষ্টতর। তারা আমাদের কাছে আশার আলোর মতো, তবে ওটুক্ইু — বেশিও নন, কমও নন। আমাদের চাই অনেক বিজ্ঞানী চাই সমেবত উদ্যোগ।
যে বিজ্ঞানীরা একদা বাষ্পশক্তি, বিদ্যুৎশক্তি আবিষ্কার করে তাদের সমাজ কাঠামো বদলে দিয়েছিলেন তেমন কোন সূযোগ আজ আমাদের বিজ্ঞানীদের নেই। বিজ্ঞানের বড় বড় আবিষ্কারগুলিতে এখন উন্নত দেশের নিরঙ্কুশ আধিপত্য। যে ব্যাপক শিল্পায়ন বিজ্ঞানের সহায়ক তাও আমাদের দেশে সহজবোধ্য কারণেই সহজ নয়। কিন্তু আজকের কৃষিও তো একটি শিল্প, তাই কৃষিবিপ্লব ঘটালেও কি সীমিত পরিসরে হলেও একটি শিল্পবিপ্লব ঘটবে না? এমনটি ঘটলে সামাজিক জাড্য ভেঙ্গে যেত, সমাজে সৃজনশীল উদ্দীপনার সঞ্চার ঘটতো এবং বিজ্ঞান আপনভূমি খুঁজে পেত। তাই এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য, বাস্তবানুগ পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মাতব্বরির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান। তবে একাজটিও বিজ্ঞানীর নয়। তাই অপেক্ষা ব্যাতীত আমরা নিরুপায়। শোনা যাচ্ছে, পৃথিবীতে বিজ্ঞানে মৌলিক আবিষ্কারে সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে আসছে এখন থাকবে শুধুই প্রযুক্তি। এমনটি সত্য হলে তা আমাদের জন্য হবে বড় দূর্ভাগ্য, কেননা বিজ্ঞানের ইতিহাসে আমাদের অবদান থাকবে শূন্যের কোথায়/অথচ বিজ্ঞান আমরা শুরুই করতে পারলাম না।

দ্বিজেন শর্মা
প্রকৃতিবিদ, অনুবাদক, বিজ্ঞান লেখক ২৮ জুন ২০০২