ঢাকা, জুলাই ২২, ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১, স্থানীয় সময়: ১০:১৭ pm

জ্ঞানই যেখানে গন্তব্য

| ২১ ফাল্গুন ১৪২১ | Thursday, March 5, 2015

sandip.jpgআমাদের বিক্রমপুরে রাঢ়িখাল গ্রামের জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৯৫ সালে সর্বপ্রথম সাফল্যের সাথে মাইক্রোওয়েভের উৎপাদন করেন এবং এর সাথে তার ধর্মাবলী নির্ধারণ করেন। বিনাতারে বার্তা প্রেরণ সংক্রান্ত প্রদর্শনীতে তাঁর উদ্ভাবিত মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গ একটি ঘর ভেদ করে অন্যঘরে একটি পিস্তল কিভাবে সক্রিয করে তার মহড়া দেন। (বর্তমানে রিমোট কন্ট্রোল নামে আমরা যে ধারণার সাথে পরিচিত তার প্রথম উদ্ভাবক জগদীশ চন্দ্র) তখন লন্ডনের ইলেক্ট্রিশিয়ান পত্রিকা লিখলো, “বর্তমানে বিনাতারে বার্তা প্রেরণ করার যতগুলো যন্ত্র উদ্ভাবিত হয়েছে জগদীশ চন্দ্র বসু উদ্ভাবিত যন্ত্র সকলকে হটিয়ে দিল”। লন্ডনের ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিনিয়ার পত্রিকাও তার ভূয়সী প্রশাংসা করে যখন নিবন্ধ প্রকাশ করে পাশ্চাত্য জগৎ তখন জগদীশ চন্দ্রের গবেষণা, কর্ম বক্তৃতায় বিমোহিত হয়ে পরে। এ সংবাদটি শুনে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, বিজ্ঞানলীর প্রিয় পশ্চিম মন্দিরে / দূরে সিন্ধুতীরে / হে বন্ধু গিয়েছো তুমি,/ জয়মাল্যখানি সেথা হতে জানি / দীনহীন জননীর লজ্জাবনত শিরে/ পরিয়েছ ধীরে”।
বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান-সংস্কৃতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অগাধ ভালবাসা ছিল। তিনি যথার্থই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে সভ্য পৃথিবীর ধ্যান-ধারণার সাথে যুক্ত হতে হলে, সংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের অচলায়তনে বন্দী এই সমাজকে উপলব্ধি করতে হলে বিজ্ঞানের অবগাহন ছাড়া উপায় নেই। বার বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা ‘গ্রহগণজীবের আবাসভূমি’ লিখেন এবং বলা হয়ে থাকে এইটিই ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপরিচয় লেখার উৎসস্থল।
ভারত উপমহাদেশে বিজ্ঞান প্রসারের সময়কাল প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর পূর্বে হলেও বাঙ্গালী বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান চিন্তাবিদের বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার ধারাবাহিক ইতিহাস কোথাও লিপিবদ্ধ নেই। বাংলাভাষার বিজ্ঞানচর্চার বিবরণও বিজ্ঞান সম্মতভাবে সুগ্রন্থিত নয়। নিউটনের গতিতত্ত্ব, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিওর সূর্যকেন্দ্রীক তত্ত্ব যখন ভারতবর্ষে পাশ্চাত্যের সমাজ, রাষ্ট্র, ধ্যান-ধারণা সংস্কৃতিক সংগ্রাম মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল; সে সময় বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী তাদের শাসনকার্য পরিচালনার সাথে এ দেশের শিা ব্যবস্থার কিছু উন্নতি ঘটায়। এতে শিত ও সচেতন মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দ্রুত যাতায়াত ও যোগাযোগের জন্য স্বয়ংক্রিয় যানবহনের ব্যবস্থা, টেল্রিগাম, টেলিফোন ইত্যাদির প্রচলন শুরু হয়, কলকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। সেসময়টিতে বাঙালির বিজ্ঞান চিন্তার বিকাশ ঘটে। প্রথমদিকে বাঙালীর বিজ্ঞান গবেষণা ছিল বিপ্তি ও ব্যাক্তিকেন্দ্রীক। ১৭৮৪ সালে কলকাতায় ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠিত হলে বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এশিয়াটিক সোসাইটি ভারতীয় যাদুঘর প্রতিষ্ঠিত করে এবং এ প্রতিষ্ঠানটি প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের আয়োজন করে। ১৮৭৬ সালে ডা: মহেন্দ্রলাল সরকারের ব্যাক্তিগত উদ্যোগে এসোসিয়েসশন অব কালটিভেশন অব সায়েন্স প্রতিষ্ঠিত হলে এইটিও আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞানচর্চায় ভারত উপমহাদেশে ভারত অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। অদ্যবধি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় এ প্রতিষ্ঠানটি অসমান্য অবদান রেখে চলেছে।
জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় আনুষ্ঠানিক এ রূপটি হাজার হাজার বছর ধরে প্রচলিত রয়েছে। ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীগত এ চর্চা একটি সময় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। সমাজ সভ্যতার ইতিহাসে এইটি বিভিন্ন সময় মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিসকাশন প্রজেক্ট ১৯৯২ সালের ১৯ মে থেকে এখানে অনানুষ্ঠানিক বিজ্ঞানচর্চ করে আসছে। এ সংগঠনটির মূল নেতৃত্বে রয়েছেন আসিফ। যিনি ইতিমধ্যে এদেশে একমাত্র পেশাদার বিজ্ঞান বক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। দর্শনীর বিনিময়ে তারা বিজ্ঞান বক্তৃতার আয়োজন করেন। লোকে টিকিট কেটে আসিফ এর বিজ্ঞান বিষয়ক বক্তৃতা শোনেন এবং এতে বেশ লোক সমাগমও ঘটে। বিষয়টি সময়ের প্রেেিত অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। ডিসকাশন প্রজেক্ট এর ঘোষণা অনুযায়ী মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর ইতিহাস, জীবনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, মানুষের ক্রমবিকাশ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তন সম্পর্কিত বিশুদ্ধ জ্ঞান গণিত, পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও জ্যোর্তিঃবিজ্ঞান তথা বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলোকে আলোচনা ও সংস্কৃতির সাধারণ অংগ করে তুলে বিজ্ঞান ও সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে অব্যহত রাখা তাঁদের মূলগত কর্মপ্রয়াস। এ সবের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিক দূরত্ব কমিয়ে আনা। “জ্ঞানই আমাদের গন্তব্য” এ বক্তব্যকে সামনে রেখে তাদের অব্যহত যাত্রা। জ্ঞানের প্রজ্জলিত শিখায় ভস্ম হোক কুসংস্কারের বেড়াজাল — কুহেলিকা, ছিন্ন হোক কুসংস্কারের সব অন্ধকার এ আজ আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা।

লেখক: রফিউর রাব্বি, সংস্কৃতি জোটের সভাপতি