ডিসকাশন প্রজেক্ট - প্রথম আলোর বিজ্ঞান প্রজন্ম পাতায় খোলা চিঠি আসিফের কাছে
প্রতিষ্ঠার ২৬ বছরে ‘ডিসকাশন প্রজেক্ট’। সকল সদস্য-শুভানুধ্যায়ীদের সংস্থার পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা!
ঢাকা, নভেম্বর ২০, ২০১৮, ৫ অগ্রহায়ন ১৪২৫, স্থানীয় সময়: ১:৫৫ am

প্রথম আলোর বিজ্ঞান প্রজন্ম পাতায় খোলা চিঠি আসিফের কাছে

খোলা কলম | ২৮ আশ্বিন ১৪০৯ | Sunday, October 13, 2002

diskas.jpgআমার ও বিজ্ঞান প্রজন্মের শুভেচ্ছা। অভিনন্দন। আশা করি, দুরূহ কর্মভার নিয়ে কুশলে আছেন। মাসের প্রথম দিন ঢাকার পরমাণু শক্তি কেন্দ্র মিলনায়তনে গিয়েছিলাম আপনার বক্তৃতা শুনতে। যেতে একটু বুঝি দেরি হয়েছে তাই আর ভেতরে বসার জায়গা পাইনি। ৫০ টাকা দিয়ে টিকেট করে ‘জীবনের উৎপত্তি’ শীর্ষক বক্তৃতা শুনতে এত লোক হাজির হবে, তা অবশ্য ভাবিনি। পরে শুনেছি, অনেকে টিকেট কেটে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুনেছেন। আমরা যারা এই অন্ধকারের দেশে বিজ্ঞানের প্রসার চাই, তাদের কাছে এ বড় আনন্দের ব্যাপার।
বাংলাদেশের মানুষ টিকেট কেটে নাটক, সিনেমা কিংবা খেলা দেখে। তারা যে বিজ্ঞানের কঠিনতম বিষয়ের বক্তৃতাও টিকেট কেটে দেখতে পারে, তা আপনি শুরু না করলে আমরা কখনো জানতে পারতাম না। সেই প্রায় এক যুগ আগে নিজের বাসায় এক-দুজন শ্রোতা নিয়ে শুরু করেছিলেন, আজ তা পূর্ণতা পেয়েছে। আমাদের গৌরব বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম চট্টগ্রামে তার গণিত কেন্দ্রের সেমিনারগুলো নিয়ে এমনটি বলতেন। তিনি বলতেন, একজন মাত্র শ্রোতা হলেই বিজ্ঞানের আলোচনা হতে পারে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। মুখস’নির্ভর পাঠ্যসূচি তাদের সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস- করে। বিজ্ঞান প্রজন্ম থেকে আমরা নিউনে অনুরণনের যে কার্যক্রম নিয়েছি, তাতে আমরা অনেক সাড়া পেয়েছি। এসব থেকে বোঝা যায়, এই প্রজন্ম আসলে চ্যালেঞ্জ ভালোবাসে। তারা সৃষ্টির আনন্দ পেতে চায়। তাদের সে সুযোগ দেওয়া দরকার। দেশ নিয়ে যারা ভাবেন, তারা যদি এসব নিয়েও একটু ভাবতেন?
সেদিন পরমানু শক্তি কেন্দ্রে আপনার বক্তৃতার শুরুতে শ্রদ্ধেয় দ্বিজেন শর্মা কিছু কথা বলেছিলেন। তিনিই বলেছেন, তাদের সময়ে কেউ বিজ্ঞান বক্তৃতাকে পেশা হিসেবে নেবে, এমনটা চিন-ার মধ্যেও ছিল না।
আমি তো জানি, শুধু শখের বশে আপনি এই বৃহত্তম কর্মে আসেননি, এসেছেন প্রাণের তাগিদে। নারায়ণগঞ্জ ডিসকাশন প্রজেক্টের লাইব্রেরি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এমনতর দুর্লভ বিজ্ঞান সংগ্রহশঅলা বাংলাদেশে আর আছে কি না, তা আমার অন-ত জানা নেই। তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন বিরাট এক জ্ঞানভান্ডার।
প্রিয় আসিফ, আপনার এই পথচলা অনেক কঠিন এবং দুরূহ। প্রতিটি বক্তৃতা অনুষ্ঠানের খরচ যোগানোর জন্য আপনাকে যেতে হয় অনেকের দোরগোড়ায়। বেশির ভাগই ফিরিয়ে দেন। এদেশে খেলা কিংবা কনসার্ট আয়োজনের বিস-র স্পন্সর পাওয়া যায়। কিন’ বিজ্ঞান বক্তৃতা কিংবা গণিত অলিম্পিয়াডের স্পন্সর পাওয়া সহজ নয়। যদিও খরচের কথা ভাবলে দ্বিতীয়টি তা অনেক কম।
আপনার হয়তো মনে আছে, এ বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে নিউরনে অনুরণনের গণিত অলিম্পিয়াড করার সময়ও আমরা এমন সমস্যায় পড়েছিলাম। এবং জেনেও আশ্চর্য হবেন না যে, আগামী জানুয়ারি মাসে প্রথম বাংলাদেশ গণিত গণিত অলিম্পিয়াড আয়োজনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার জন্য আমরা এখনো কোনো স্পনসর জোগাড় করতে পারিনি।
দুঃখ করে একদিন বলেছিলেন, এ দেশে ভারতের টাটা-বিড়লার মতো বিজ্ঞানমনস্ক উদ্যোগী কর্মবীরের অভাব রয়েছে। আপনার সঙ্গে এই বিষয়ে আমি একমত নই। হয়তো টাটা-বিড়লার মতো ধনকুবের আমাদের নেই কিন’ এ দেশেই আছেন অনেক মহতী কর্মবীর। রয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান, যাদের কেউ একজন এগিয়ে আসতে পারে আপনার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
আমাদের দেশে অনেক অফিসে খেলোয়াড়দের জন্য চাকরির ব্যবস’া রয়েছে। তাদের চাকরি-কর্মই হলো মাঠে গিয়ে খেলা। বিদেশে কিন’ খেলোয়াড়দের মতো লেখক, বিজ্ঞানীদের জন্যও বিভিন্ন অফিসে চাকরির সুযোগ রয়েছে। যেখানে চাকরি-কর্ম হলো লেখালেখি কিংবা বিজ্ঞানচর্চা।
আমি জানি না, বাংলাদেশে কেউ এ রকম নজির সৃষ্টি করতে এগিয়ে আসবে কি না। তবে আমার সি’র বিশ্বাস, কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে। টাটা-বিড়লা না হোক আমাদের কেউ আপনার বিজ্ঞান বক্তৃতাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেবে।
আমার মনে আছে, আজ থেকে সাত বছর আগে চাষাঢ়ার পথকলি স্কুলে প্রথম আপনার বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলাম। সেদিনই বলেছিলাম, শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, সারা দেশে ঘুরে বেড়ান আপনার বিশাল সংগ্রহশালা নিয়ে। সাত বছরের মধ্যে ঢাকায় একটি অজনপ্রিয় মিলনায়তর আপনার বক্তৃতা শুনতে আসা দর্শকদের জায়গা দিতে পারে না।
প্রিয় আসিফ, স্বপ্ন দেখি আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন এই বাংলার বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। একটি ছোট ল্যাপটপ, প্রজেক্টর আর আপনার চমৎকার সংগ্রহশালা নিয়ে। হতে পারে সেটি একটি গাড়ির মধ্যে। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বলবেন, কীভাবে আইনষ্টাইন কাগজে আঁক কষে সমাধান করে ফেলেছিলেন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় রহস্যকে। কীভাবে ক্রিক আর ওয়াটসন ডিএনএ অণুর গঠন খুঁজে পেয়েছিলেন। চট্টগ্রামের পাহাড় ঘেরা একটি গবেষণা কেন্দ্রে জামাল নজরুল ইসলাম কীভাবে খোঁজেন এই দুনিয়ার পরিণতি।
ছোট্ট এই স্বপ্ন পূরণের সামর্থ্য এককভাবে আমার বা আপনার নেই, তবে অনেকে এগিয়ে এলে এ কোনো স্বপ্নই নয়। একেবারে নিরেট বাস্তব। প্রিয় আসিফ হতাশ হবেন না। ঘাবড়াবেনও না। কেউ না কেউ এগিয়ে আসবেনই আমাদের এই স্বপ্ন পূরণের জন্য। প্রশ্ন-উত্তরের স্টাইলে সত্যকে খোঁজায় আমাদের যাত্রায় শরিক হবেন। বিজ্ঞান-সচেতনতা প্রসারের মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করায় আপনার চেষ্টা সফল হোক। জ্ঞানই হোক আপনার কুশল কামনায়।

গুণমুগ্ধ,
মুনির হাসান
পক্ষে বিজ্ঞান প্রজন্ম, ১০ অক্টোবর, ২০০২।

প্রথম আলোর বিজ্ঞান প্রজন্ম পাতায় প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর রবিবার ২০০২