ডিসকাশন প্রজেক্ট - জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাপ নিয়ে গবেষণা
প্রতিষ্ঠার ২৬ বছরে ‘ডিসকাশন প্রজেক্ট’। সকল সদস্য-শুভানুধ্যায়ীদের সংস্থার পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা!
ঢাকা, ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০১৯, ৭ ফাল্গুন ১৪২৫, স্থানীয় সময়: ৬:২৪ pm

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাপ নিয়ে গবেষণা

হার্পিটোলজি | ১৭ শ্রাবণ ১৪২২ | Saturday, August 1, 2015

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সাপ নিয়ে গবেষণাসমুদ্রের বিভিন্ন বাস্তুতান্ত্রিক পরিবেশে অভিযোজনের মাধ্যমে স্থল থেকে সামুদ্রিক সাপগুলো উদ্ভূত হয়েছে। যেমন: সাঁতারের জন্য ইল বা বাইন মাছের মতো চ্যাপ্টা লেজ, ডুবে থাকার সুবিধার্থে কবাটিকাযুক্ত নাসাছিদ্র, স্বাদু পানি সরবরাহের জন্য লবণ নিষ্কাশক গ্রন্থি, পানি থেকে অক্সিজেন নেওয়ার জন্য ত্বকীয় শ্বসন প্রভৃতি। বিশ্বে প্রায় ৭০টিরও বেশি সামুদ্রিক সাপ পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে এদের সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক কোনো তথ্য নেই। এদেশে ১২-১৩ প্রজাতির সামুদ্রিক সাপ পাওয়া গেলেও অধিকাংশ তথ্যই ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানীদের প্রবন্ধ কিংবা অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা। ফলে গবেষণায় মনোযোগের অভাবে স্বাধীনতার প্রায় ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও অজানাই রয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সাপের রহস্যময় জীবন ও জেলেদের সাথে সাপের জীবনযুদ্ধের গল্প। স্থলজদের চেয়ে (প্রায় ১০ গুণ) বেশি শক্তিশালী সমুদ্রের সাপের বিষ, যা সাপের বিষ প্রতিষেধক টিকা ও ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনে জীববৈচিত্র্যের হুমকি মোকবিলায় বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও কাজ করে যাচ্ছেন। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অন্যতম প্রধান বিষয় হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির বৈচিত্র্যের সঠিক হিসাব এবং নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে সাম্যক জ্ঞান রাখা। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন-এর রেড লিস্ট অনুসারে গবেষণার অভাবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অধিকাংশ (প্রায় ৩৪ শতাংশ) সামুদ্রিক সাপ সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই। ফলে সামুদ্রিক সাপ সংরক্ষণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০১২ সালে থেকে দেশে প্রথমবারের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুর রাজ্জাক, বিভাগীয় শিক্ষক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ফিরোজ জামান- এবং অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেইড বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক সাপ বিশেষজ্ঞ ড. কেইট স্যানডারস (উৎ কধঃব ঝধহফবৎং) এর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সাপ নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন। আবদুর রাজ্জাক বিগত কয়েক বছর ধরে বন্যপ্রাণী বিশেষ করে বাংলাদেশের সাপ ও ব্যাঙ নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণামূলক কাজ করছেন। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিজ্ঞান সাময়িকীতে তার গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সামুদ্রিক সাপ নিয়ে তার গবেষণার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রেণী বিন্যাস বিদ্যার (ট্যাক্সনমি) আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সংগৃহীত নমুনা সঠিকভাবে শক্ত করে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক সাপের একটি সঠিক তালিকা প্রণয়ন করা। যা পরে সামুদ্রিক সাপ নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা ও সংরক্ষণে বন্যপ্রাণী গবেষকদের এবং সাপের কামড় সংক্রান্ত চিকিৎসায় ডাক্তারদের সহযোগিতা করবে। এতে সহযোগিতা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফরিদ আহসান, শ্রীলংকা এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক সাপ বিশেষজ্ঞরা। বিজ্ঞান সংগঠন ডিসকাশন প্রজেক্টের অঙ্গসংগঠন, ঐবৎঢ়বঃড়ষড়মরপধষ খধনড়ৎধঃড়ৎু ইধহমষধফবংয -এর মোমিন মেহেদী সেলিম (ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা), ডা. আবু হাসান লাভলু (ভ্যাটেনারি সার্জন) সহ অন্যান্য গবেষক কর্মীরা (আবদুর রশিদ মাহি, রাসেল হোসেন, কানিজ ফাতেমা) মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন।মূলত উপকূলীয় জেলেদের কাছ থেকে সাপের নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে শনাক্তকরণসহ ও অন্যান্য কাজ করা সম্পন্ন করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত দেশের উপকূলবর্তী প্রায় ১৯টি জেলার অধিকাংশ দ্বীপ যেমন সেন্টমার্টিন, সন্দ্বীপ,হাতিয়া; কক্সবাজার এবং সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকাগুলোতে কোথায় কত প্রজাতির সাপ রয়েছে, নতুন কোনো প্রজাতি আছে কি-না, প্রজাতিভিত্তিক স্বতন্ত্র সংখ্যার বিভিন্নতা, ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও বাসস্থানভিত্তিক বৈচিত্রতা এবং জীবতাত্তি্বক ও বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় যেমন খাবার, প্রজনন প্রভৃতি বিষয়াদি নিয়ে মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত সংগৃহতি নমুনা থেকে প্রায় নয় -দশ প্রজাতির সাপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে, যেগুলো সম্পর্কে পূর্ববর্তীতে কোনো সঠিক তথ্য ছিল না। সেই সাথে পাওয়া গেছে নতুন আরও কয়েকটি প্রজাতি। সংগৃহীত সাপের টিস্যু নিয়ে পরে আণবিক (ডি এন এ) পর্যায়ে গবেষণা করা হবে, ফলে সংগৃহীত প্রজাতিগুলো সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে। জানা যাবে এদের আদি ইতিহাস এবং বিবর্তনের গল্প। সামুদ্রিক সরীসৃপ প্রাণিগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক সাপ প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি। বাস্তুতন্ত্রের খাদ্য শৃঙ্খলে এরা সবচেয়ে উপরে অবস্থান করে। সামুদ্রের বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষার্থে সামুদ্রিক সাপ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে। তাই প্রয়োজন আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এবং সরকারি কিংবা বেসরকারি আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা। তাহলে বঙ্গোপসাগরের সাপ সেই সাথে জীববৈচিত্র সংরক্ষণে উপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

 

# আসিফ